কোভিড-১৯ এ থমথমে পুরো পৃথিবী। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। আকাশ বাতাস ভারী হচ্ছে লাশের মিছিলে। প্রতিদিনই হচ্ছে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড। যেমন শান্তিতে নেই মানুষ, তেমন পশু-পাখিরাও শান্তিতে নেই। চারিদিকে মৃত্যুর সাথে ধেয়ে আসছে ক্ষুধা আর ক্ষুধা। শুনেছিলাম, পেটে খেলে নাকি পিঠে সয়। তা চারপাশ দেখেই টের পাচ্ছি। দেশে চলছে লকডাউন। বন্ধ হয়ে গেছে দোকানপাট, শপিংমল, খাবার হোটেল, রেস্টুরেন্ট এমনকি যানবাহন গুলোও। ঢাকা শহরে অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায় অসংখ্য ভাসমান প্রাণি যেমন কুকুর, বিড়াল, কাক, চিল ইত্যাদি। অধিকাংশের আহার জুটতো রাস্তার পাশে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবারের অংশ, কারোর আবার সিটি কর্পোরেশন এর ময়লার ডাস্টবিন হতে, কারোর আবার রাস্তার পাশের খাবার হোটলের উচ্ছিষ্ট অংশ হতে, আবার কেউ কেউ আবার কসাইখানার উচ্ছিষ্ট অংশ হতে। লকডাউনের কারণে তাদের খাবার উৎস গুলা বন্ধ হয়ে আছে কিন্তু ওদের পেট তো খাবার না পেয়ে বসে থাকে না। বাইরে বের হলেও বুঝতে পারতাম তাদের করুণ আর্তি।

লকডাউনের কারণে শেকৃবি ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেছে, ছাত্ররাও সবাই বাড়ি চলে গেছে। পুরো ক্যাম্পাস ফাঁকা পড়ে আছে। শেরেবাংলা হলে আছি বলতে গেলে ১৫-১৬ জন ছাত্র আর ক্যাম্পাসের অতন্দ্র প্রহরী বেশ অনেকগুলো কুকুর ও বিড়াল। তারাও চরম আকারে খাদ্য সংকটে পড়ে যায়। আগে আমার রুমের কাছে দুইটা বিড়াল থাকতো। এখন দেখি ৭-৮ টা বিড়াল ও ৩-৪ কুকুর এসেছে। বুঝতে আর দেরি হলো না, ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় সবাই ছুটিতে বাড়ি চলে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে হলের খাবার ডাইনিং ও ক্যান্টিন। তাই ফাঁকা হলে ওরা আমার রুমের সামনে জায়গা করে নিছে। রুমে যখন খেতে বসতাম ওদের চেয়ে থাকা দেখে মনে হতো ওদের চোখ বলছে ওরা ক্ষুধার ভার বহন করতে পারছে না। আমি একজন প্রাণি চিকিৎসক, ওদের ভাষা বুঝতে দেরি হলো না। কি আর করবো রান্নার সময় দুই পট চাল বেশি দিতাম। খাওয়া শেষ হলে একটু ঝোল আর আলু ভাতের সাথে মাখিয়ে খাওয়াতে থাকলাম। কি করব অবলা প্রাণি গুলোর ডাক্তার আমি মনের অজান্তেই ভালবাসা চলে আসে।রুমের সামনের কুকুর বিড়াল গুলা মোটামুটি খেতে পাচ্ছে। প্রতিদিন বাজার থেকে আসার সময় গেটের সামনে,কেন্দীয় খেলার মাঠের কুকুর গুলা আমার হাতের খাবার গুলার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু কিছুই করার ছিল না, বেকার ছাত্র হিসেবে ওদের দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ যে আমার নেই। মনে মনে ভাবতাম আমার সাধ আছে কিন্তু সামর্থ্য নেই।

৭ মে ২০২০ তারিখে এম.এ. মান্নান স্যার (সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি এন্ড প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, শেকৃবি) আমাকে ফোন করে বললেন, তুমিতো ক্যাম্পাসে আছো, ক্যাম্পাসের কুকুর ও বিড়াল গুলোকে খাওয়াতে পারবা ? আমি স্যারকে বললাম, স্যার আমিতো রুমের সামনে যে গুলা আছে সেই গুলাকে খাওয়াচ্ছি। স্যার বললেন, তুমি নিজের কিছু টাকা দিয়ে ওদের খাওয়ানো শুরু করো, কিছুদিন পর আমি তোমাকে কিছু টাকা পাঠাবো, তুমি চালিয়ে যাও। পরে আমি অনুপ, ওমসাগর, হাবিব, আকাশ, সুলতান এদের সাথে শেয়ার করলাম। সবাই আমার সাথে কাজ করার জন্য মত দিল।

আমি পরেরদিন ৮ মে ২০২০, আমার নিজের খাওয়ার টাকা হতে ২০০ টাকা দিয়ে চাল, ডাল, ব্রেড কিনে খিচুড়ি রান্না করলাম আর বাজার হতে দুই ব্যাগ বিভিন্ন মাছের কান, ফুলকা, পাখনা, লেজ ফ্রি তে আনলাম। সাথে মুরগির দোকান হতে মুরগির চামড়া, পা এক ব্যাগ আনলাম। আর শুরু করলাম খাওয়ানো। “আই, আই, আই” বলে ডাকার সাথে সাথে ছুটে এল কুকুর, বিড়াল, কাক ও চিল। বুঝতে আর বাকি থাকল না ওদের কান মনে হয় ‘আই’ শোনার অপেক্ষায় ছিল। ওদের খাওয়ার আগ্রহ দেখে আর ক্ষুধার্ত চোখ দেখে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিলাম ওইদিন থেকেই। ওইদিন কিছু ছবি তুলে আমাদের ফ্যাকাল্টির কিছু পেজে আপলোড দিলাম, সবাই আমার কাজের প্রসংসা করলো। আমি সম্মানিত ডিন মহোদয় প্রফেসর আনোয়ারুল হক বেগ (ডিন, এনিম্যাল সায়েন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ, শেকৃবি) স্যারকে প্রাণিগুলোর খাওয়ানোর কথা জানালে উনি আমাকে এই ব্যাপারে আর্থিক সহযোগিতার কথা জানালেন। সাথে কয়েকজন সম্মানিত শিক্ষক মহোদয় আর্থিক অনুদানের কথা জানালেন। এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, শেকৃবি আর্থিক অনুদানের কথা জানালেন। চিন্তার অবসান ঘটল সেদিন হতেই, ভাবলাম খাওয়ানো চলবে। পরেরদিন হতে আমার সাথে অনুপ নিজ আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে আসলো।

সবাই যখন কোভিড-১৯ এর কারনে বাড়ি চলে গেছে, যারা হলে আছে তারাও বের হয় না খুব একটা। তার মধ্যে আমি প্রতিদিন বাজারে যাচ্ছি খাবার আনার জন্য। সত্যি বলতে আমার একটুও ভয় লাগে না। এই অবলা প্রাণি গুলার জন্য কিছু একটা করছি এটাই আমার সাহসের উৎস। আগারগাঁও কাঁচা বাজারে মাছ আর মুরগির দোকানে গেলেই ওরা বলে কুকুর,বিড়াল খাওয়ানো মামা আইছে, উনারে বেশি বেশি করে সব দাও। সবাই ওখানে ‘কুকুর বিড়াল খাওয়ানো মামা’ নামে চেনে। এখন আমার প্রতিদিনের শিডিউল আগারগাঁও কাঁচা বাজার এবং তালতলা কাঁচা বাজারে যাওয়া আর দুপুর ১:৩০-২:০০ ঘটিকার মধ্যে খাবার সরবরাহ করা। প্রতিদিন প্রায় ২০-২৫ টা কুকুর, ২৫-৩০ টা বিড়াল, ৪০-৫০ টা কাক, ৮-১০ টা চিল খেতে আসে। ওদের ঘেউ-ঘেউ, মিউ-মিউ, কা-কা শব্দে মুখরিত হয়ে যায় ক্যাম্পাস। প্রতিদিন খাবারের তালিকায় রাখা হয় মুরগির মাংস / মাছ, মাছের উচ্ছিষ্ট অংশ (মাছের বাজার হতে প্রতিদিন আনা হয়), মুরগির চামড়া ও পা, বিস্কুট / ব্রেড, খিচুড়ি / ভাত ইত্যাদি। আমি প্রতিদিন যখন বাজার করতে বের হয় ওরা আমার পিছে পিছে ভার্সিটির সেকেন্ড গেট পর্যন্ত হাটতে থাকে। আবার যখন খাবার নিয়ে ফিরি ওরা সেকেন্ড গেট হতে আমার রুম পর্যন্ত আসবে। মনে মনে ভাবি ওরা কি আমায় ‘গার্ড অব অনার’ দিচ্ছে!

খাওয়ানোর শুরুতে খেয়াল করেছিলাম কুকুর, বিড়াল গুলো রুগ্ন আর শরীরে ক্ষত ছিল, কামড়ের দাগ ছিল। কারন খাবারের সংকটের জন্য কোথাও একটু খাবার পেলেই মারামারি করে যে পারতো সে নিতো। মানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’। একদিন দেখলাম একটা বিড়াল এর পেটে অনেক বড় একটা ক্ষত। সেটা হতে পুঁজ বের হচ্ছে আর প্রচন্ড দুর্গন্ধ। এতই ব্যথা যে ঠিকমত দাড়াতেই পারতে ছিলোনা। অনেক চেষ্টার পর আমি আর অনুপ অধিকারী বিড়ালটাকে ধরলাম। পরে ক্ষত হতে পুঁজ বের করে ভায়োডিন দিয়ে ওয়াশ করে দিলাম। সাথে এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টামিনিক এবং এন্টি-ইনফ্লাম্যাটরি ড্রাগস ইনজেক্ট করে দিয়েছিলাম। তিনদিন ডোজ চালিয়েছি সাথে নেবানল পাউডার ক্ষত জায়গায় লাগিয়েছিলাম। বিড়ালটি সুস্থ হয়েছিল কয়েক দিন পরে। এখন নিয়মিত খাবার দেওয়ার ফলে প্রাণি গুলোর স্বাস্থ্যের বেশ উন্নতি হয়েছে। সাথে সাথে শরীরের ক্ষত গুলাও হারিয়ে গেছে। ওদের লোম গুলা মসৃণ আর চকচকে। খাবার দেওয়ার পাশাপাশি হালকা চিকিৎসা চালিয়ে যায় প্রয়োজনের তাগিদে। ঈদের দিন ওদের জন্য ‘ঈদ ফিস্ট ফেস্টিভাল’ করেছিলাম। ওরা তৃপ্তি সহকারে খেয়েছিল। দেখতে দেখতে ০৬.০৬.২০ তারিখে এক মাস পূর্ণ হয়েছিল, তাদের ওদের জন্য মান্থলি ফিস্ট ফেস্টিভাল করেছিলাম। ০৭.০৬ ২০ তারিখে অনুষদের সম্মানিত ডিন মহোদয় এসেছিলেন। তিনিও প্রাণি গুলোর মাঝে খাবার সরবরাহ করলেন। ফাঁকা ক্যাম্পাসে প্রাণিগুলোর সাথে সময় কেটে যাচ্ছে।

এই অবলা প্রাণীগুলো এখন খুব অসহায়! এই দুর্যোগের মুহূর্তে যে যার এলাকায় যার যেমন সামর্থ্য আছে সেভাবে এগিয়ে আসলে মানুষের পাশাপাশি এই অভুক্ত প্রাণীগুলোও বেঁচে থাকবে। কি রোদ, কি বৃষ্টি, কি গরম! থেমে নেই প্রতিদিনের কার্যক্রম। আজ ১০ জুন,  একটানা ৩৪তম দিন পার করলাম, এই কার্যক্রম চলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলবে। আমরা চাই, কোভিড-১৯ এ ভালো থাকুক সকল প্রাণ।

আল-ওয়াসিফ
AL – WASEF
এমএস ফেলো (প্যারাসাইটোলজি),
ডিপার্টমেন্ট অব মাইক্রোবায়োলজি এন্ড প্যারাসাইটোলজি,
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,
ঢাকা-১২০৭।

01751277776


0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *