প্রাণী নিয়ে আমার জীবনে খুব থ্রিলিং কোন ঘটনা নেই। যেমনঃ খুব কাছ থেকে বাঘ দেখা, একটু হলেই হায়েনার সামনে পড়তাম—এইসব। যেগুলো আছে সেসব একান্তই নিজের স্মৃতিকথা। এসব অনুভূতি—লিখে খুব বেশি প্রকাশ করা যায় না। তবুও লিখতে ইচ্ছে করলো।
১. মানিক
খুব ছোটবেলার কথা বলছি। তখন বাসায় মুরগি পালা হতো। মা মুরগি পালতেন। গ্রাম থেকে এক আত্মীয় দেশি মুরগির কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে এসেছিলেন। নিয়মিত তাদের খাবার দেয়া, যত্ন নেয়া, সন্ধ্যায় ঠিকমতো ঘরে ফিরল কিনা—মা এসব লক্ষ্য রাখতেন। শখ থেকে করা, কোন কাজে যত্নের অভাব এমনিতেই থাকে না। অনেক বেশি যত্নের কারণেই কিনা জানিনা—একটা কালো মুরগি বাদে বাকি সবগুলো মুরগি মরে গেল। আমি তখন খুব ছোট বলে সেই মুরগির বাচ্চাটাকে এক প্রকার বন্ধু বানিয়ে ফেললাম।
তখনো স্কুলে যাই না। সকালবেলা মুরগিটাকে কার্টন থেকে বের করে ছেড়ে দিতাম। মুরগিটা খুব দ্রুত আমার পোষ মেনে গেল। হাত বাড়ালেই ধরা দিত। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর, ঘটল অভাবনীয় ঘটনা। এক সকালে মুরগিটাকে ছেড়ে দিতে গিয়েছি—গিয়ে দেখি কার্টনের ভেতরে একটা ডিম! আমি মা! মা! বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম! ডিমটা নিয়ে মাকে দেখালাম। মা খুব খুশি হলেন। আমি সারাদিন ডিমটা নিজের কাছে রেখে দিলাম। আমার নজর মুরগির দিক থেকে চলে গেল—ডিমের দিকে। এই সুন্দর গোল বলের মত জিনিসটা কিভাবে কার্টনের ভেতর চলে আসল—আমার কাছে সে এক বিরাট রহস্য!
মা বললেন, ‘ডিমটা ওর ঘরে রেখে আসো।’
এই কথা শুনে আমার মন গেল খারাপ হয়ে। আমি বললাম, ‘কেন মা?’
মা বললেন, ‘ঘরে ডিম না থাকলে নতুন ডিম পাড়বে না। যাও গিয়ে রেখে আসো।’
আমার বয়স কম। এই কথার সত্য মিথ্যা যাচাই করার জ্ঞান বুদ্ধি আমার হয়নি। আমি যথাস্থানে ডিমটা রেখে আসলাম। পরেরদিন সকালে উঠে শুনলাম আরেকটা ডিম পেড়েছে। এভাবে চলতে লাগল। যেদিন ডিম পাড়ত না, সেদিন মন খারাপ হত অনেক। মা আমাকে অনেকবার সেই ডিম সেদ্ধ বা ভেজে দিতে চেয়েছিল। আমি কড়া গলায় বলেছিলাম, ‘ওর ডিম খাওয়া যাবে না। আমি ডিম জমাবো৷’
এভাবে শখের বসে আমি অনেক ডিম জমিয়েছিলাম। সেই ডিম দিয়ে এক, দুই গোনা শিখেছিলাম। মুরগিটা এত পোষ মেনেছিল যে, রাতের বেলায় আমরা যখন টিভি দেখতাম, সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো। ক ক করতে করতে পাশে এসে বসতো। আমরা একসাথে টিভি দেখতাম। সে টিভির কি বুঝতো কে জানে? কিন্তু টিভি ছাড়লেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেনি—এমন কখনো হয়নি!
একদিন সন্ধ্যায় সে ঘরে ফিরল না। আমি তো কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছি। চারিদিকে খোঁজ লাগানো হল। ওকে পাওয়া গেল বাসার পাশেই একটা জংলা মত জায়গায়। ওর ডানা ভাঙা ছিল। ধারণা করা হল—কুকুর বা বিড়াল হয়তো ওকে কামড় দিয়ে আহত করেছে। কিন্তু একদম মেরে ফেলেনি। ওকে বাসায় নিয়ে আসলাম। সেই রাতেই মুরগিটা মারা গেল। আমি যদিও অনেক ছোট—তবুও পোষা প্রাণী হারাবার বেদনায় আমি আচ্ছন্ন হয়ে থাকলাম অনেকদিন। ডিম গুলোও ঘরে থেকে গেল বেশ কিছুদিন। পরে সেগুলো যেন কাকে দিয়ে দেয়া হয়েছিল। কারণ, সেই ডিম আমি খেতে রাজি হইনি, কাউকে খেতেও দেইনি। জেদি ছিলাম অনেক।
আমি মুরগিটার নাম রেখেছিলাম—মানিক। মোরগ হলে এই নাম ঠিক ছিল। কিন্তু মুরগির বেলায় এই নাম হাস্যকর শোনাতে পারে। কিন্তু, ওই বয়সে এতকিছু কি মাথায় থাকে?
২. রত্নবতী ও মেঘময়ী
আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। একটা মুরগির বাসায় পালার জন্য আনা হল। এতদিনে আমি ছোটবেলার সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তবুও যেহেতু পোষা প্রাণী—একখানা বাহারি নাম তো দিতেই হবে! আর আমিই নামগুলো ঠিক করি। এবারে নাম দিলাম—রত্নবতী।
যে বাসায় আমরা থাকতাম, সেই বাসার বাড়িওয়ালাও অনেক হাঁস মুরগি পালতেন। রত্নাবতীও এদের সাথে মিলে মিশে থাকত। যথা সময় সে ডিম দেয়া শুরু করল। ডিম ফুটে বাচ্চা হলো। একটা বাচ্চা আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল। তার গায়ের রঙ ছিল ধূসর—মেঘের মত। নাম দিলাম মেঘময়ী।
রত্নাবতী দুধ মাখা ভাত খেত। মজা করে মাঝে মাঝে চাও খেতে দিতাম! সে আগ্রহ নিয়ে খেতো। আয়নায় নিজের মুখ দেখে ঠোঁকর দিত। আয়নার ওপাশের স্বত্তাটিকে খোঁজার চেষ্টা করতো! এই জিনিসগুলো যখন ঘটত তখন আমরা সবাই বেশ আনন্দ পেতাম। লিখে এসব মনের ভাব কতটুকু প্রকাশ পাচ্ছে, বুঝতে পারছি না!
৩. মিনু ও টুকটুকি
২০১৫ সালের শেষ রোজার দিন। আমরা সবাই ইফতার করে উঠেছি। হঠাৎ দেখি কোথা থেকে যেন কালো – শাদা মিক্সড গায়ের রঙের একটা বিড়াল ঘরে এসে ঢুকেছে। আমরা উৎসুক হয়ে বাটিতে দুধ খেতে দিলাম। সে চুক চুক করে খেল। একবার খেতে পেলে এরা বার বার চায়। আমরাও খাইয়ে খাইয়ে ওকে পোষ মানিয়ে ফেললাম।
কখনো বিড়াল পুষব আমরা কেউ ভাবিনি। কিন্তু মিনু কিভাবে কিভাবে যেন থেকে গেল। ধীরে ধীরে আমাদের পরিবারের একটা অংশ হয়ে উঠল সে। বিড়াল বাচ্চা দিলে অনেকগুলো একসাথে দেয়। মিনু ব্যতিক্রম—দিল মাত্র একটি ছানা।
আমি টেবিলে বসে পড়ছিলাম। তখন অনেক রাত। সে মুখ দিয়ে সদ্যোজাত বাচ্চাটিকে আগলে ধরে আমাকে দেখাতে নিয়ে এসেছে। আমি ভাবলাম ইঁদুর ধরেছে নাকি? পরে বুঝলাম, মিনু বাচ্চা দিয়েছে!
মিনু টুকটুকিকে ঠিকমতো দুধ খাওয়াতো না। আমরা অনেক ধৈর্য নিয়ে মিনুর বুকে টুকটুকিকে চেপে ধরে দুধ খাওয়াতাম৷ এভাবে একটা সময়, মিনু নিজেই দুধ খাওয়ানো শিখে গেল। টুকটুকি দেখতে খুব সুন্দর হয়েছিল। কেমন ডোরাকাটা বাঘের মত! পর্যাপ্ত খাবার পেয়ে সে দ্রুতই গোলগাল হয়ে উঠল। আমার সাথে টুকটুকির অনেক সুন্দর সময় কেটেছে। মজা করে টুকটুকিকে একটা ফেসবুক আইডিও খুলে দিয়েছিলাম! সে সেখানে তার বিভিন্ন আপডেট শেয়ার করতো।
জন্মের একবছর পূর্তিতে টুকটুকির জন্মদিন পালন করা হয়েছিল। একদিন সকালে টুকটুকি ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি। কোথায় কি হয়েছিল কে জানে? অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন।
মিনু নিজেও একবার সতের দিন ঘরে আসে নি। কোথাও আটকা পড়েছিল হয়তো। যেদিন সে ফিরে এলো, দেখলাম তার শরীর ভেঙে গিয়েছে। কিছু খেতে পারে না। আস্তে আস্তে তাকে সারিয়ে তুলেছিলাম আমরা সবাই।
৪. কুমকুম
বাসার সামনে একবার একটা কবুতর পড়ে থাকতে দেখলাম। ধরেই নিলাম হয়তো মারা গিয়েছে। কাছে গিয়ে বুঝলাম—না, এখনো বেঁচে আছে। ঘাঁড় বেঁকে গিয়েছিল। হাঁটতে পারে না। হাঁটতে গেলেই ঘাঁড় বেকে যায়। আর উল্টে পড়ে ডানা ঝাপ্টায়।
খয়েরি রঙের এই কবুতরটার নাম দিয়েছিলাম—কুমকুম। ওকেও আমরা সুস্থ করে তুলেছিলাম। ও একদিন উড়তে পারল। আমরা এরপর ওকে আর বন্দী করে রাখিনি। একদিন সে সত্যিই তার আপন ঠিকানায় ডানা মেলে চলে গেল।
৫. নিউটন
আমার সর্বশেষ বন্ধুর নাম নিউটন। যারা সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কুর গল্প পড়েছেন, তারা জানেন—শঙ্কুর ল্যাবরেটরিতে একটা বিড়াল থাকে। যার নাম নিউটন। আমি সেখান থেকে এর নাম দিলাম নিউটন। ওকে আমরা ফেসবুকের ক্যাট সোসাইটি থেকে এডপ্ট করেছিলাম। ওর বয়স যখন এক মাস, তখন ওকে ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় কেউ আবিষ্কার করে। পরে কাছাকাছি হওয়ায় আমরা ওকে নিয়ে আসি। সত্যি বলতে, বাসায় একটা পোষা প্রানী থাকলে অনেক সুন্দর হাসিখুশি সময় কাটানো যায়। এটা যারা কখনো কিছু পোষেননি তারা বুঝবেন না।
আমাদের বাসার প্রতিটা সদস্যেরই—প্রাণীদের প্রতি সব সময় একটা সফট ফিলিংস কাজ করে। ফেসবুক, নিউজপেপারে প্রানীদের নিয়ে খারাপ কোন খবর পড়লে, আমরা সবাই ব্যথিত হই। কেরলায় হাতির ঘটনায় আমরা সবাই খুব মর্মাহত হয়েছিলাম। শুধু তাই না—আমার বাবা যখনই কোন অভুক্ত প্রাণী রাস্তায় দেখেন, কিছু না কিছু কিনে খাওয়ান।
নিউটন এখনো সুস্থ ভাবে বেঁচে আছে। ২০১৮ সালের শুরুতে ওকে আমরা এডপ্ট করি। আজ ২০২০ এর জুন মাস। আড়াই বছর ও আমাদের সাথে আছে। ও যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে যাবে সেদিন আমাদের কি অবস্থা হবে, কেউ ভাবতে পারি না। নিউটনের জীবনটায় টানাপোড়েন গিয়েছে অনেক। সেগুলো বলছি অল্প অল্প করে—
নিউটন দুই দুইবার ছয়তলা থেকে মাটিতে পড়েছে। এবং আল্লাহর রহমতে বেঁচে গিয়েছে। যদিও এই কারণে ওর নাকে সমস্যা, আরো অনেক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আমরা সবাই ওকে পশু হাসপাতালে নিয়ে, ভেট ডাক্তারকে দেখিয়েছি। ও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়েছে। যদিও এখনো সে নিচু হয়ে পানি খেতে পারে না। উপর থেকে ফোটায় ফোটায় পানি পড়ে, সে হা করে জিহ্বা বের করে খায়।
নিউটন প্রতিদিন সকালে চলে যায়, রাতে ফিরে আসে। অনেক জায়গায় ঘুরে, সে ঠিকই বাড়ি চিনে নেয়। ছয়তলা সিঁড়ি বেয়ে, সে তার ঘর চিনে নিতে কখনোই ভুল করে না।
ঝড় বৃষ্টির রাতে যে যদি বাইরে থাকে, তাহলে আমরা এখন আর চিন্তা করি না। আগে করতাম। কিন্তু যখন দেখি, সকাল বেলা ঘরে ফেরার সময় তার শরীর খড়খড়ে শুকনো, তখন আমরা বুঝে নেই সে নিরাপদ স্থানেই থাকে৷ এর কোন ব্যতিক্রম ঘটে না।
নিউটনের জন্য বারান্দায় আলাদা দোলনার ব্যবস্থা আছে। সে অবসরে সেখানে দোল খেতে খুব পছন্দ করে।
এই হলো আমার কিছু নির্বাক বন্ধুদের গল্প। প্রথম অভিজ্ঞতাটা লেখার সময়, মা আমাকে সাহায্য করেছেন৷ কারণ ঘটনার খুটিনাটি আমার মনে ছিল না।
প্রাণীর প্রতি ভালবাসা থেকেই আসলে এই গল্পগুলোর জন্ম। নিউটন ছাড়া বাকি কেউই এখন আর আমাদের সাথে নেই। কিন্তু সবাইকেই আমি অনেক ভালবাসি—মিস করি। সবার সাথে যে স্মৃতি আমার গড়ে উঠেছে, সেগুলো বুকের ভেতর লালন করি। নিউটন যেন আমাদের মাঝে আরো অনেক বছর সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকে, পরম করুণাময়ের কাছে এটাই চাওয়া। আমরা সবাই প্রাণীদের উপর সদয় হলেই, ওরা পাবে বসবাসের উপযোগী একটা পৃথিবী। এই পৃথিবীর উপর আমাদের যেমন অধিকার আছে, ওদেরও তেমনি আছে।
প্রাণীজগতকে পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখী দু’ ডানাযোগে উড়ে বেড়ায় তারা সবাই তোমাদের মতই একেকটি শ্রেণী। আমি কোন কিছু লিখতে ছাড়িনি। অতঃপর সবাই স্বীয় প্রতিপালকের কাছে সমবেত হবে।’ (সূরাঃ আন’য়াম, আয়াতঃ ৩৮)
পৃথিবীটা হয়ে উঠুক সকল প্রজাতির জীবের জন্য উত্তম বাসস্থান—এই শুভকামনা।
লেখকঃ মারুফ মুহাম্মাদ, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

2 Comments

Paid betting tips · February 17, 2022 at 8:12 am

whoah this blog is fantastic i really like reading your posts.
Keep up the great work! You know, a lot of people are huntibg
around for this info, you can help them greatly.

my site Paid betting tips

Risa Fayard · May 25, 2022 at 1:12 pm

Spot on with this write-up, I really think this web site needs far more attention. I’ll probably be returning to see more, thanks for the advice!

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *